সোমবার৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ২২শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

সোমবার৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ২২শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

যে পথে হাঁটছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬ | ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ

যে পথে হাঁটছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

ছবি : সংগৃহীত

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত এপ্রিলে সাময়িক যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে দুই দেশই শান্তির জন্য দফায় দফায় প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাব দিয়ে আসছে। এরপরও দুই পক্ষের নেতারা বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে প্রয়োজন হলে তাঁরা একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে প্রস্তুত। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল এ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা সত্ত্বেও যেসব ছোটখাটো সংঘাত ঘটেছে, তাতে শান্তির বদলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

৫ জুন (শুক্রবার) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য এই অঞ্চলের যেসব মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহার করা হবে, সেগুলোকে ইরান নিজেদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ধরে নেবে। গত কয়েক সপ্তাহে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশেরই বিভিন্ন সম্পদ ও অবকাঠামোতে হামলার পর এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দেশটির নৌবাহিনী ওমান উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধের মধ্যে সাগরপথে চলাচলে বাধা দেওয়া এবং বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলের ট্যাংকার আটকে রাখার অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে। বর্তমান এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে—এখন কোনটির সম্ভাবনা বেশি—শান্তি নাকি নতুন করে যুদ্ধ?

সম্প্রতি কোথায় কোথায় হামলা হয়েছে

কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুনা জানিয়েছে, গত বুধবার সকালে কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হেনেছে। এ হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ফ্লাইট বন্ধ রাখতে এবং ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়েছিল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, কুয়েতের দিকে ছোড়া ইরানের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ধ্বংস হয় বা লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই ভূপাতিত হয়। ইরানের বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।

ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ‘এ অঞ্চলের একটি দেশে’ মার্কিন হেলিকপ্টারগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তারা মূলত কুয়েতকেই বুঝিয়েছে। তবে হেলিকপ্টারগুলো বিমানবন্দরে ছিল কি না কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের কারণে বিমানবন্দরের ক্ষতি হয়েছে কি না, তা পরিষ্কার নয়।

তাসনিম আরও জানিয়েছে, বাহরাইনে একটি বিমানঘাঁটি এবং মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে আইআরজিসি। তবে সেন্টকমের ভাষ্য, বাহরাইনের দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মাঝপথেই ধ্বংস করা হয়েছে। কুয়েত বা বাহরাইনে কোথাও কোনো মার্কিন সেনা বা সম্পদের ক্ষতি হয়নি।

এর আগে গোরুক ও কেশম দ্বীপে ইরানের রাডার ও ড্রোনঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি কেশমের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারেও মার্কিন হামলা হয়। এ ছাড়া সাধারণ যাত্রীবাহী জাহাজে হামলার চেষ্টাকারী ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়। এর জবাবেই ইরান এসব পাল্টা হামলা চালায়।

তেহরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন বাহিনী ইরানের একটি তেলের ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর জবাবে আইআরজিসির নৌবাহিনী ‘পানায়া’ নামে একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়। যুদ্ধবিরতির পর সৃষ্টি হওয়া সংক্ষিপ্ত শান্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে সাম্প্রতিক এ ঘটনাগুলো উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে, ১৭ মে আবুধাবি কর্তৃপক্ষ জানায়, একটি ড্রোন হামলার কারণে বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরের সীমানার ঠিক বাইরে একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরে আগুন লেগে যায়। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং তেজস্ক্রিয়তার মাত্রাও স্বাভাবিক ছিল।

এর আগে মে মাসের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতও (ইউএই) ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। তারা জানায়, পূর্ব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে ইরান ‘একঝাঁক’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। এতে তিন ভারতীয় নাগরিক আহত হন এবং ফুজাইরাহ পেট্রোলিয়াম শিল্প অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারে আগুন ধরে যায়।

যুক্তরাষ্ট্র কখন চুক্তি হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে

মার্কিন নেতারা বেশ কয়েকবারই বলেছেন যে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি শান্তিচুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে অথবা যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে। গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দেশটির আইনপ্রণেতাদের বলেন, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি ছেড়ে দিতে রাজি হয়, তবেই কেবল যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে।

রুবিও কংগ্রেসকে জানান যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জীবিত আছেন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় ‘ক্রমে বেশি মাত্রায় যুক্ত’ হচ্ছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় মোজতবা খামেনির বাবা ও তাঁর পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় মোজতবা নিজেও আহত হয়েছেন বলে খবর বেরিয়েছিল। এর পর থেকে তাঁকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সর্বশেষ শান্তির প্রস্তাবটি যখন ইরান যাচাই-বাছাই করে দেখছিল, তখন ৬ মে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা (ইরান) একটি চুক্তি করতে চায়। গত ২৪ ঘণ্টায় আমাদের খুব ভালো আলোচনা হয়েছে এবং খুব সম্ভবত আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারব।’

ইরান কি চুক্তি হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দিয়েছে

শুক্রবার সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি ও ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি বৈঠক করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘এ অঞ্চলে টেকসই শান্তির জন্য ধারাবাহিকভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।’

গত ২২ মে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যখন ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ‘আলোচনা ও পরামর্শ’ করতে তেহরান সফরে যান, তখন মনে হয়েছিল যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বেশ এক ধাপ এগিয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সাংবাদিকদের জানান, এ সফরের মানে এই নয় যে ‘আমরা কোনো টার্নিং পয়েন্ট বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পৌঁছে গেছি’।

এরপর ২৮ মে খবর আসে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তিতে (এমওইউ) পৌঁছেছে। মার্কিন সরকারি সূত্রগুলো আল-জাজিরাকে জানায়, দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়াতে এবং স্থায়ীভাবে যুদ্ধ শেষ করার জন্য আলোচনা শুরু করতে রাজি হয়েছে দুই দেশ। সূত্রগুলো এ-ও জানায় যে এই চুক্তির রূপরেখায় ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন বা তেহরান কেউই এ সমঝোতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। তার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কখন আবার যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছে

বেশ কয়েকবারই এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহের বুধবার নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। সেখানে বলা হয়, ট্রাম্প তাঁর সহযোগীদের বলেছেন, ইরানের কোনো হামলায় যদি কোনো মার্কিন সেনা নিহত হন, তবে তিনি যুদ্ধবিরতি অবসানের কথা বিবেচনা করবেন। তবে মনে হচ্ছিল, এর বাইরে ইরানের সঙ্গে পুরোদমে যুদ্ধ আবার শুরু করতে তেমন একটা আগ্রহী নন ট্রাম্প।

এর আগে ১৯ মে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা এমন কোনো চুক্তি করব না, যা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর সুযোগ করে দেবে। প্রেসিডেন্ট যেমনটি আমাকে একটু আগেই বলেছেন, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত আছি। আমরা ওই পথে (যুদ্ধ) যেতে চাই না, তবে যদি বাধ্য হতে হয়, তবে প্রেসিডেন্ট তা করতে ইচ্ছুক ও সক্ষম।’

১৭ মে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর নতুন দফার হামলার আগে খুব বেশি সময় আর বাকি নেই। দুই বাক্যের ছোট একটি বার্তায় ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানের জন্য সময় ফুরিয়ে আসছে এবং তাদের উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। তা না হলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সময় খুবই মূল্যবান!’

গত ২০ এপ্রিল পিবিএস নিউজ ট্রাম্পের কাছে জানতে চেয়েছিল, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে কী হবে? জবাবে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তখন প্রচুর বোমাবাজি শুরু হবে।’

ইরান কি যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দিয়েছে

ইরানের বার্তা সংস্থা আইআরআইবির খবর অনুযায়ী, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি শুক্রবার বলেছেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে টানা ৪০ দিন টিকে থাকা কোনো হাসির বিষয় নয়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এ অঞ্চলের দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছি যে ইরানে হামলার জন্য ব্যবহৃত মার্কিন ঘাঁটিগুলো আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।’

মঙ্গলবার লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে কথা বলেন ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। এ সময় তিনি বলেন, লেবাননের ওপর ইসরায়েলের হামলা যদি চলতে থাকে, তবে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বাতিল করে সরাসরি যুদ্ধের পথে হাঁটতে পারে।

Facebook Comments Box
Default Advertisement

আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার

সোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনিরবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Design and Development by : webnewsdesign.com