ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ২০ অগাস্ট ২০২৬ | ১১:৩৪ এএম

কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কোনো আগাম বার্তা না দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক জোটে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ও সিউলের পূর্বনির্ধারিত বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া শুরুর পরপরই ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার নির্দেশ দেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১১ দিনের ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়া কমিয়ে পাঁচ দিনে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি কিছু ফিল্ড ট্রেনিংও সীমিত করা হয়েছে।
ট্রাম্পের আকস্মিক নির্দেশে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের পর দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তারা বৈঠকে বসেন। সমঝোতা অনুযায়ী, ১১ দিনের পরিবর্তে মহড়া পাঁচ দিন চলবে। একই সঙ্গে ফিল্ড ম্যানুভারের কিছু অংশ কমানো হবে। কিছু অনুশীলন বাতিল করে সিমুলেশনে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, এ ধরনের যৌথ সামরিক মহড়া উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের কাছে উসকানিমূলক বার্তা পাঠায় এবং এতে অযথা খরচ বাড়ে। একই সঙ্গে তিনি কিমের সঙ্গে নিজের ইতিবাচক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যান্য মতপার্থক্যও ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতায় সিউলের অবস্থান নিয়ে ওয়াশিংটনের অসন্তোষ রয়েছে। ট্রাম্প এর আগে দক্ষিণ কোরিয়াকে ইরান-সংক্রান্ত মার্কিন প্রচেষ্টায় আরও সহযোগিতার জন্য চাপ দিয়েছিলেন।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ঘোষণার বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়াকে আগে কোনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। ফলে মিত্রদেশের সঙ্গে এমন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটনের একতরফা পদক্ষেপ নিয়ে সিউলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌথ মহড়ার পরিধি কমানোর তাৎক্ষণিক সামরিক প্রভাব সীমিত হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বড়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো নিয়মিত যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধপ্রস্তুতি। মহড়ার পরিধি কমানোর সিদ্ধান্তে মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ুং পরিস্থিতি সামাল দিতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক মিত্রতার ওপর আস্থার কথা বলেছেন, অন্যদিকে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও সামরিক স্বনির্ভরতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। ট্রাম্পের পদক্ষেপকে তিনি কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য একটি পদক্ষেপ হিসেবেও দেখছেন।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার রক্ষণশীল মহলে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ বেশি। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র যদি ধীরে ধীরে সামরিক উপস্থিতি ও যৌথ প্রশিক্ষণ কমিয়ে দেয়, তাহলে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হতে পারে। এমনকি দেশটির নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিতর্কও নতুন করে সামনে আসতে পারে।
১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু ট্রাম্পের আকস্মিক ও একতরফা সিদ্ধান্ত সেই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিউলে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়ার সময়সীমা কমানোর সিদ্ধান্ত শুধু একটি সামরিক মহড়ার পরিবর্তন নয়; এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোটের ভবিষ্যৎ, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং এশিয়ার নিরাপত্তা ভারসাম্য নিয়েও নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সূত্র: আল জাজিরার বিশ্লেষণ



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত