ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:১৬ পিএম

কারও কবজি উড়ে গেছে, কেউ হারিয়েছেন চোখ। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ ও অগ্নিসংযোগে ফ্রান্সের শিক্ষা আন্দোলন ক্রমেই সহিংস রূপ নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে—পরিস্থিতি কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে?
বিদ্যালয়ের শোচনীয় পরিবেশের উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে চলমান আন্দোলনে মঙ্গলবার বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন শহরে প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক রাজপথে নামেন।
রাজধানী প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, লিওঁ, নান্তেস ও রেনসহ প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলন দমনে বিভিন্ন স্থানে রায়ট পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ করলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারি হিসাবে, মঙ্গলবার প্রায় দুই লাখ মানুষ মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেন। শুধু প্যারিসেই বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, সারাদেশে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা চার লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার প্রায় ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৪৩ পুলিশ সদস্য। আন্দোলন শুরুর পর দুই সপ্তাহের বেশি সময়ে প্রায় ছয় হাজার ১০০ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৮০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে; তাদের মধ্যে এক হাজার ৫০০ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
আহত শতাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক
শিক্ষাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় উদ্বেগ জানিয়েছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান ল্যকরনু। তিনি জানিয়েছেন, আন্দোলন শুরুর পর এখন পর্যন্ত অন্তত ২১৫ জন কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থী এবং ৮৫ জন স্কুলকর্মী ও শিক্ষক আহত হয়েছেন।
ল্যকরনু এটিকে সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে ভারী মাশুল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এলিসি প্যালেসে মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ পুলিশের ভূমিকার সাফাই দিয়ে বলেছেন, প্রায় সব ক্ষেত্রেই পুলিশের প্রতিক্রিয়া ছিল আনুপাতিক। তবে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দাঙ্গায় রূপ নেওয়ায় পুলিশকে কঠোর হতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ফ্রান্সের শিক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ফরাসি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ‘আনুপাতিকতাহীন দমনপীড়নের’ অভিযোগ তুলে তা বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
অ্যামনেস্টি ফ্রান্সের প্রধান আন সাভিনেল-বারাস বলেন, গত এক সপ্তাহে প্রকাশ্যে আসা ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে টিয়ারগ্যাস, লাঠি ও অন্যান্য কঠোর পুলিশি কৌশলের বিপজ্জনক ব্যবহারের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চাপের মুখে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত বিভাগ ১০টি ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
কারও কবজি উড়ে গেছে, কেউ হারিয়েছেন চোখ
আন্দোলনে সহিংসতার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়েছে কয়েকজন শিক্ষার্থীর গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায়।
উত্তর ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাতের কবজি বিস্ফোরণে উড়ে গেছে।
এর আগে বুধবার টুর্স শহরে ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর মাথায় প্রতিরক্ষামূলক বিস্ফোরণ বলের আঘাত লাগে। এতে তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায়।
উত্তর-পশ্চিম প্যারিসে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরকে খুব কাছ থেকে পুলিশ গ্রেনেড সদৃশ অস্ত্র ছুড়লে তার বেশিরভাগ দাঁত ভেঙে যায় এবং মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার কপাল ও চোয়াল স্থির করা হয়েছে। বর্তমানে কথা বলতে পারছে না সে; স্ট্র দিয়ে তরল খাবার খেতে হচ্ছে।
‘আমাদের দাবি তো খুব সাধারণ’
মঙ্গলবার প্যারিসের প্লাস দে লা নেশন চত্বরে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যানা বলেন, তাদের দাবি খুবই সাধারণ—উন্নত শিক্ষার পরিবেশ, পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং ভালো স্কুল ভবন।
তার অভিযোগ, এসব দাবির বিপরীতে কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত সহিংস।
মার্সেইয়ের শিক্ষার্থী ওশিয়ান জানান, বছরের পর বছর তিনি শিক্ষকবিহীন শ্রেণিকক্ষে বসেছেন। অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে যোগ্য বিকল্প শিক্ষকও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দাবিতে অনেক শিক্ষকও আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। রেন শহরের শিক্ষক রোমেন দুবার্গ বলেন, তারা পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে সহকর্মীদের নিয়ে রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নেন।
সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
ফ্রান্সে আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের মাত্র সাত মাস আগে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন শুরু হওয়ায় ম্যাক্রোঁ সরকার নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।
বাজেট ঘাটতি কমানোর চাপের মধ্যে থাকা সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দল ‘লা ফ্রান্স ইনসোমিজ’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। তবে দলটি অহিংস আন্দোলনের আহ্বান জানিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত