ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২১ এএম

দীর্ঘ কয়েক দশকের সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সিশেলস। দেশটির প্রত্যন্ত আলদাব্রা অ্যাটোলে বিরল প্রজাতির আলদাব্রা জায়ান্ট টরটয়েজের সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার ছাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দ্বীপটিতে পূর্ণবয়স্ক ও প্রায় পূর্ণবয়স্ক কচ্ছপের সংখ্যা আনুমানিক ১ লাখ ৮৩ হাজার বলে উঠে এসেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্য পরিবেশে স্বাধীনভাবে বিচরণকারী বিশালাকার কচ্ছপের এটিই বিশ্বের বৃহত্তম পরিচিত জনগোষ্ঠী। একসময় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা এই প্রজাতির পুনরুদ্ধার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পাঁচ বছরের জরিপে মিলেছে নতুন তথ্য
সিশেলস আইল্যান্ডস ফাউন্ডেশন (এসআইএফ) ও যুক্তরাজ্যের এক্সটার বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে জরিপটি পরিচালিত হয়। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা কচ্ছপের সংখ্যা নির্ধারণ করেন।
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে প্রকাশিত তথ্যে আলদাব্রা অ্যাটোলে কচ্ছপের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় পরও এই প্রজাতির বিশাল জনগোষ্ঠী টিকে রয়েছে এবং পর্যবেক্ষণকালজুড়ে তাদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। পৃথিবীতে প্রাকৃতিক পরিবেশে বিশালাকার স্থলকচ্ছপের বিচরণ রয়েছে এমন দুটি উল্লেখযোগ্য স্থানের একটি আলদাব্রা অ্যাটোল। অন্যটি প্রশান্ত মহাসাগরের গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ।
একসময় সংখ্যা নেমেছিল এক হাজারের নিচে
কচ্ছপের বর্তমান সংখ্যা সংরক্ষণ প্রচেষ্টার সাফল্য তুলে ধরলেও অতীতে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। উনবিংশ শতাব্দীতে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত শিকার ও শোষণের কারণে আলদাব্রা জায়ান্ট টরটয়েজের সংখ্যা এক হাজারেরও নিচে নেমে এসেছিল।
দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ১৯৮১ সালে আলদাব্রাকে কঠোর সংরক্ষিত অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৮২ সালে ইউনেস্কো দ্বীপটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের স্বীকৃতি দেয়। গবেষকদের মতে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য এটি।
সিশেলস আইল্যান্ডস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ফ্রাউকে ফ্লেশার-ডগলি বলেন, অ্যাটোলে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি বিশালাকার কচ্ছপ স্বাধীনভাবে বিচরণ করছে। পরিবেশ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার যে অসাধারণ ফল বয়ে আনতে পারে, এই পরিসংখ্যান তার প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, আলদাব্রাকে রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করা ব্যক্তিদের পাশাপাশি সিশেলস ও সমগ্র বিশ্বের জন্যও এটি আনন্দের সংবাদ।
ঘন ঝোপঝাড়ের কারণে গণনায় ছিল চ্যালেঞ্জ
গবেষণার সহলেখক ড. ন্যান্সি বানবুরি জানান, দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চললেও অ্যাটোলের ঘন উদ্ভিদের কারণে কচ্ছপের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন ছিল।
গবেষকেরা সরাসরি দেখতে পাওয়া কচ্ছপের পাশাপাশি ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে থাকা প্রাণীর সংখ্যাও বৈজ্ঞানিক মডেলিংয়ের মাধ্যমে হিসাব করেছেন। এতে প্রজাতিটির জনসংখ্যা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে কচ্ছপের সংখ্যা পর্যবেক্ষণ ও সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরিতেও এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বহিরাগত প্রাণীর হুমকি
কচ্ছপের সংখ্যা বাড়লেও সংরক্ষণ কার্যক্রমে শিথিল হওয়ার সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আলদাব্রায় দীর্ঘস্থায়ী ও ঘন ঘন খরা দেখা দিতে পারে। এতে কচ্ছপের প্রয়োজনীয় খাবার ও ছায়ার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দ্বীপের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বুনো বিড়াল ও কালো ইঁদুরের মতো বহিরাগত প্রাণীও কচ্ছপের জন্য বড় হুমকি। এসব প্রাণী কচ্ছপের ডিম ও সদ্য ফোটা ছানা শিকার করে।
গবেষকদের মতে, ক্ষতিকর বহিরাগত প্রাণীগুলো নির্মূল করা সম্ভব হলে কচ্ছপের প্রজননের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা দূর হতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্রজাতিটিকে আরও সহনশীল করে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
এক্সটার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্নওয়াল ক্যাম্পাসের পোস্টডক্টরাল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ড. ডেভ হাডসন বলেন, এই গবেষণার ফলাফল পরিবেশকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টার প্রতিফলন এবং কচ্ছপগুলোর জন্য বড় সুসংবাদ। তবে এটি সংরক্ষণ কার্যক্রমের শেষ নয়, বরং দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, খরা ও বহিরাগত প্রজাতির ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় গবেষণার তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপকদের আগাম পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত