ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:৪২ পিএম

আবাসন সংকট ও লাগামহীন বাড়িভাড়ার প্রতিবাদে স্পেনজুড়ে বিক্ষোভে নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায় জরুরি আইন পাসে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে শনিবার রাজধানী মাদ্রিদসহ বিভিন্ন শহরে প্রায় ৫০টি সমাবেশ ও মিছিল হয়।
বিক্ষোভকারীরা ভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ এবং আবাসন খাতে বড় বিনিয়োগ তহবিলের নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন।
বিক্ষোভের এক দিন আগে শুক্রবার স্পেনের পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী জোট সরকারের দুটি জরুরি আবাসন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। এর পরদিনই দেশজুড়ে নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
মাদ্রিদের ভাড়াটিয়া ইউনিয়নের দাবি, রাজধানীতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তবে সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। ফলে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে আয়োজক ও সরকারের হিসাবের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা দিয়েছে।
৮৭ বছরের বৃদ্ধার উচ্ছেদ ঘিরে ক্ষোভ
সাম্প্রতিক আবাসন আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে মাদ্রিদের বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনায়। ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় তা পরিশোধ করতে না পারার পর গত মাসে তাকে বাসা ছাড়তে হয়।
ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। পরে সামাজিক চাপের মুখে তিনি যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, সেটির মালিক প্রতিষ্ঠান উরবাগেস্তিওনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাকে কম ভাড়ায় আবার সেখানে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়। তবে সমঝোতার পরও বিক্ষোভ থামেনি।
সংসদে দুই আবাসন প্রস্তাবই বাতিল
আবাসন সংকট কমাতে শুক্রবার পার্লামেন্টে দুটি পৃথক ডিক্রি উপস্থাপন করে সানচেজ সরকার।
প্রথম প্রস্তাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত স্থগিত, ২০২৮ সালের আগে শেষ হওয়ার কথা থাকা ভাড়ার চুক্তি আরও দুই বছর বাড়ানো, পর্যটকদের ব্যবহৃত অ্যাপার্টমেন্টে কর বাড়ানো এবং বড় বিনিয়োগ তহবিলের আবাসিক সম্পত্তি কেনায় বিধিনিষেধের প্রস্তাব ছিল।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে ভাড়ার চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নের ব্যবস্থা রাখার কথা ছিল।
তবে ভোটাভুটিতে প্রথম প্রস্তাবটি ১৭৮-১৭২ ভোটে এবং দ্বিতীয়টি ১৮৪-১৬৬ ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। রক্ষণশীল পিপলস পার্টি (পিপি), ডানপন্থী ভক্স এবং কাতালোনিয়ার মধ্য-ডানপন্থী স্বাধীনতাপন্থী দল জুন্টস প্রস্তাবগুলোর বিরোধিতা করে।
‘পুরো শহরের চাবি আমাদের হাতে’
মাদ্রিদের বিক্ষোভে বিভিন্ন ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় নামেন আন্দোলনকারীরা। তারা ‘ভাড়াবাদের জন্য শান্তি থাকবে না’ এবং ‘ভবিষ্যৎ গড়তে পড়াশোনা করি, ছোট একটি অ্যাপার্টমেন্টের জন্য নয়’—এমন স্লোগান দেন।
অনেকে হাতে থাকা ঘরের চাবি ঝাঁকিয়ে বলেন, ‘পুরো শহরের চাবি আমাদের হাতে।’
২৬ বছর বয়সী গ্রন্থাগারকর্মী মার্কোস সাইন্স বলেন, আগে বন্ধুদের সঙ্গে দুই বেডরুমের একটি ফ্ল্যাট ভাগাভাগি করে থাকতেন এবং মাসে ৯০০ ইউরো ভাড়া দিতেন। এখন মাদ্রিদে এক বেডরুমের ফ্ল্যাটের ভাড়াই অনেক ক্ষেত্রে ১ হাজার ইউরো ছাড়িয়ে গেছে।
ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
ভ্যালেন্সিয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
সব বিক্ষোভ অবশ্য শান্তিপূর্ণ ছিল না। পূর্বাঞ্চলীয় শহর ভ্যালেন্সিয়ায় একটি রিয়েল এস্টেট সম্মেলন চলাকালে প্যালাউ দে লেস আর্টস রেইনা সোফিয়ার কাছে বিক্ষোভ হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকজন বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড সরিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে বস্তু ছুড়ে মারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাবার বুলেটসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয় পুলিশ।
স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিভিই জানিয়েছে, ওই ঘটনায় নয়জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত এবং পাঁচজন আটক হয়েছেন।
মাদ্রিদে ডানপন্থী একটি চরমপন্থী গোষ্ঠীর তিন সদস্যকেও আটক করেছে পুলিশ। তাদের কয়েকজন নাৎসি স্যালুট প্রদর্শন করে বিক্ষোভকারীদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বাড়ির ঘাটতি ৭ লাখ
ব্যাংক অব স্পেনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন নির্মাণ ও আবাসনের চাহিদার মধ্যে ব্যবধানের কারণে স্পেনে প্রায় ৭ লাখ বাড়ির ঘাটতি রয়েছে।
জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে দেশটিতে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ।
রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান আইডিয়ালিস্তার তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে স্পেনে ভাড়ার খরচ বেড়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। মাদ্রিদে এই বৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
বার্সেলোনা ও মাদ্রিদ বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভাড়ার শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে। প্রতি বর্গমিটারে ভাড়া যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৮০ ইউরো ও ২২ দশমিক ৭০ ইউরো।
সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান
আবাসন সংকট নিয়ে আন্দোলন এখন শুধু ভাড়া কমানোর দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। মাদ্রিদের ভাড়াটিয়া ইউনিয়ন সরকারের প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোকে অপর্যাপ্ত বলে মনে করছে।
সংগঠনটি সংকটের প্রতিবাদে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ফলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও বড় আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে আবাসন সংকট স্পেনের রাজনীতিতেও চাপ বাড়াচ্ছে। সংসদে গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসে ব্যর্থতা প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সংখ্যালঘু জোট সরকারের সংসদীয় সমর্থনের সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।
স্প্যানিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে নভেম্বরেই আগাম নির্বাচন হতে পারে বলে জল্পনা রয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
আকাশছোঁয়া ভাড়া, বাড়ির মূল্যবৃদ্ধি, আবাসনের ঘাটতি এবং সংসদে সরকারের সংস্কার প্রস্তাবের ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে স্পেনে আবাসন সংকট ঘিরে রাজপথের আন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপ দুটিই বাড়ছে।
সূত্র: বিবিসি



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত