ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৩৮ পিএম

ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানলের কারণে সৃষ্ট বিষাক্ত ধোঁয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ শ্বাসকষ্টজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি শিশু। আক্রান্তদের অনেকেই কাশি, ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়ার মতো জটিলতায় ভুগছে।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলা দাবানলের ধোঁয়া ইন্দোনেশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিবেশী মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বিভিন্ন এলাকায় বায়ুমানের সূচক অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে ইন্দোনেশিয়া সরকার ৫৪ হাজারের বেশি কর্মকর্তা ও একাধিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। বোর্নিও ও সুমাত্রা দ্বীপে বিমান থেকে পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। তবে দেশটির বিশাল আয়তন এবং পিটল্যান্ডের জটিল প্রাকৃতিক কাঠামোর কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ইন্দোনেশিয়ার ক্যাবিনেট সচিব টেডি ইন্দ্র উইজায়া সোমবার বলেন, আকাশ থেকে মাটি পর্যন্ত সব বাহিনী একযোগে কাজ করছে। আগুন নেভানো, ধোঁয়ার প্রভাব কমানো এবং জনগণকে বন ও ভূমির আগুন থেকে রক্ষা করতে সম্ভাব্য সবকিছু করা হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ায় সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে দাবানল দেখা যায়। তবে এ বছর তথাকথিত ‘গডজিলা এল নিনো’র প্রভাবে অতিরিক্ত শুষ্ক আবহাওয়া তৈরি হওয়ায় আগুন ও ধোঁয়াশা আরও তীব্র হয়েছে।
স্বাধীন বন পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম ‘নুসানতারা অ্যাটলাস’-এর তথ্যমতে, বুধবার পর্যন্ত দেশজুড়ে প্রায় ৭ লাখ ৩৪ হাজার ‘হটস্পট’ শনাক্ত হয়েছে। এই সংখ্যা ২০১৯ সালের ভয়াবহ দাবানল মৌসুমের তুলনায় ৩০ শতাংশেরও বেশি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে, যা গ্রেটার লন্ডনের আয়তনের প্রায় ছয় গুণ।
দাবানলের কারণে অনেক এলাকায় স্কুল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালগুলোতেও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর চাপ বেড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার ৮৯১ জন। ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৩৩৬ জনে।
মানুষের পাশাপাশি বিষাক্ত ধোঁয়াশায় বিপদে পড়েছে বন্যপ্রাণীও। বিশেষ করে সংকটাপন্ন ওরাংওটাং প্রজাতি বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। সম্প্রতি পশ্চিম কালিম্যানতান প্রদেশের একটি পাম অয়েল বাগান থেকে অসুস্থ অবস্থায় একটি ওরাংওটাং উদ্ধার করা হয়। হাইপোক্সিয়ার জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হলেও প্রাণীটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পরে ঘটনাটির একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
সরকারের ভূমিকার প্রতিবাদে পশ্চিম কালিম্যানতানের আদিবাসী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্লাস-অ্যাকশন মামলা করেছেন। এতে সরকারের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলাকারীদের আইনজীবী গ্লোরিও সানেন এক বিবৃতিতে বলেন, প্রতি বছরই এ ধরনের দুর্যোগ ঘটছে। তার দাবি, এই পুনরাবৃত্তিই প্রমাণ করে যে দাবানল থেকে সৃষ্ট ধোঁয়াশার ঝুঁকি সম্পর্কে বিবাদীরা আগে থেকেই জানতেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইন্দোনেশিয়া সরকার গত কয়েক সপ্তাহে কয়েক দফা কৃত্রিম বৃষ্টিপাত বা ক্লাউড-সিডিংয়ের চেষ্টা চালিয়েছে। এ কাজে সহায়তা করতে গত মাসের শুরুর দিকে জাপানের সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের সদস্যরা বোর্নিওতে পৌঁছান। মেঘে লবণ ক্রিস্টাল বা সিলভার আয়োডাইড ছিটিয়ে বৃষ্টিপাত বাড়ানোর এই পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে আবহাওয়াবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
দাবানলের ধোঁয়ায় ইন্দোনেশিয়ার বাইরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মালয়েশিয়ার সারাওয়াক রাজ্যেও সম্প্রতি পাঁচ দিনব্যাপী কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আগামী অক্টোবরে সম্ভাব্য তীব্র শুষ্ক মৌসুমের আগে জলবিদ্যুৎ বাঁধগুলোর পানির স্তর ধরে রাখা এবং ধোঁয়াশা কমানোই ছিল এর উদ্দেশ্য।
সারাওয়াকের উপ-প্রধানমন্ত্রী ডগলাস উগাহ এমবাস সাংবাদিকদের বলেন, অক্টোবর আরও বেশি গরম ও শুষ্ক হতে পারে। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকতেই যতটা সম্ভব পানির স্তর বাড়িয়ে নিতে চান তারা।
এদিকে, ধোঁয়াশা ফিলিপাইন পর্যন্ত পৌঁছেছে। দেশটির স্থানীয় কর্মকর্তারা বাসিন্দাদের যথাসম্ভব ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের সতর্ক করতে নিয়মিত ধোঁয়াশাবিষয়ক দৈনিক সতর্কবার্তা জারি শুরু করেছে।
সূত্র: বিবিসি



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত