সফিউর রহমান সফিক
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ৩:০৮ পিএম

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের পাহাড় !
সরকারি চাকুরি বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন, প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন এবং খোদ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের জনৈক এক সচিবের নাম ভাঙিয়ে দাপট দেখানোর এক নজিরবিহীন অভিযোগ উঠেছে ঢাকা মহানগরীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুলশান সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাজস্ব সার্কেলের সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত কানুনগো সালেকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। সার্ভেয়ার থেকে কানুনগো পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর, সরকারি নিয়মনীতিকে সম্পূর্ণ তোয়াক্কা না করে বিশেষ তদবিরের জোরে তিনি পুনরায় তাঁর আগের কর্মস্থলেই পদায়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। সেখানে যোগদানের পর থেকেই নামজারি, খাজনা দাখিলা, ভুল সংশোধনসহ সাধারণ ভূমি সেবা প্রার্থীদের জিম্মি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
বদলি প্রজ্ঞাপনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি একই স্টেশনে যোগদান
ভূমি মন্ত্রণালয় ও ভূমি সংস্কার বোর্ডের স্পষ্ট ও কঠোর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী— কোনো সার্ভেয়ার পদোন্নতি পেয়ে কানুনগো হলে তিনি পূর্বে যে স্টেশনে বা কর্মস্থলে কর্মরত ছিলেন, কোনো অবস্থাতেই তাকে একই স্টেশনে কানুনগো হিসেবে পুনরায় পদায়ন বা বদলি করা যাবে না। এই ধরনের আদেশকে সম্পূর্ণ বেআইনি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তবে কানুনগো সালেকুল ইসলামের বেলায় ঘটেছে উল্টো চিত্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কানুনগো সালেকুল ইসলাম দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে গুলশান রাজস্ব সার্কেলে সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি তিনি বিশেষ কারিশমায় কানুনগো পদে পদোন্নতি পান। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তাকে ঢাকার বাইরে বা অন্য কোনো সার্কেলে বদলি করার নিয়ম থাকলেও, তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে বিশেষ মহলের তদবিরে পুনরায় আগের কর্মস্থল অর্থাৎ গুলশান সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে কানুনগো হিসেবে যোগ দেন। যা ভূমি প্রশাসনের চাকুরি বিধিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
জনৈক সচিবের নাম ভাঙিয়ে ‘ধরাকে সরা’ জ্ঞান
অভিযোগে প্রকাশ, পদোন্নতি ও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় এই বেআইনি পোস্টিং নিশ্চিত করতে সালেকুল ইসলাম রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যালয়ের জনৈক এক সচিবের নাম ব্যবহার করে ধরাকে সরা করছেন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন প্রশাসন ও বিভাগীয় কর্মকর্তাদের রীতিমতো কোণঠাসা করে রেখেছেন। অফিসে কর্মরত সহকর্মী ও সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছেও তিনি নিজেকে ‘বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট’ হিসেবে জাহির করেন, যার কারণে তাঁর নানাবিধ অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
জিম্মি ভূমি সেবা , নামজারি ও দাখিলায় লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য
গুলশান ভূমি অফিসে যোগদানের পর থেকেই কানুনগো সালেকুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
• নামজারি (মিউটেশন) ও মিস কেস সাধারণ নিয়মে নামজারি করার ক্ষেত্রে নানা অজুহাতে ভুলত্রুটি ও খতিয়ানের জটিলতা দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে দালাল ও তাঁর নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফাইলভেদে লাখ কোটি টাকা ঘুষ দাবি করা হয়।
• খাজনা দাখিলা ও ভুল সংশোধন
ভূমির দাখিলা কাটা কিংবা দলিলের করণিক ভুল সংশোধনের মতো সাধারণ সেবা নিতে উক্ত কানুনগোর গুলশান অফিসে এসেও সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন সালেকুল ইসলাম সিন্ডিকেট দ্বারা। টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল টেবিলে পড়ে থাকে, আর দাবি করা টাকা দিলেই মুহূর্তের মধ্যে তা অনুমোদন পেয়ে যায়।
নামে-বেনামে বৃত্ত-বৈভব ও কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স
একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারী হয়েও কানুনগো সালেকুল ইসলামের জীবনযাত্রা ও অঢেল সম্পদ অর্জনের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। দীর্ঘ কয়েক বছর গুলশান ও এর আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পোস্টিং থাকার সুবাদে অবৈধ আয়ের টাকা দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের সাম্রাজ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে ।
১. একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তার ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস রয়েছে।
২. বেনামী ব্যবসা
নিজ পদের প্রভাব খাটানোর জন্য বিভিন্ন ব্যবসায় অংশীদারিত্ব ও বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।
৩. ব্যাংক ব্যালেন্স ও গাড়ি
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে তার ও তার নিকটাত্মীয়দের নামে কোটি কোটি টাকার এফডিআর এবং নগদ অর্থ জমা রয়েছে। এছাড়াও তাঁর ব্যবহারের জন্য রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি।
সালেকুলের দম্ভোক্তি
চাকুরীর বিধিমালা লংঘন করে বিপুল অংকের অর্থ খরচ করে গুলশান সহকারী কমিশনার ভূমি রাজস্ব সার্কেলে বদলি হয়ে আসা কানুনগো সালেকুল ইসলাম দম্ভোক্তি সহকারে বলে বেড়ান বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারদের হাউজিং প্রকল্পের কাজ জন্য ঊর্দ্ধতন মহল তাদের স্বার্থে তারা এখানে তার বদলি পূর্বক নিয়োগ দিয়েছেন, এই নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন শুদ্ধ কি অশুদ্ধ এটা তারাই বলতে পারবেন। এমন দম্বোক্তি প্রতিনিয়ত তার । তবে সাদেকুল ইসলাম জনৈক সচিবের দোহাই দিয়ে নানান অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে সেই সচিব আদৌও জানেন কি তার দাম বিক্রি করে একি করছে সালেকুল ।
প্রতিকার চান ভুক্তভোগীরা
ভূমি সেবাকে ডিজিটালাইজড এবং দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বারবার কঠোর বার্তা দেওয়া হলেও, সালেকুল ইসলামের মতো কর্মকর্তাদের কারণে সরকারের সেই সদিচ্ছা ভেস্তে যাচ্ছে। একজন বিতর্কিত কর্মকর্তা কীভাবে ভূমি মন্ত্রণালয় ও ভূমি সংস্কার বোর্ডের প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করে ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে বছরের পর বছর একই চেয়ার আঁকড়ে ধরে আছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ ভূমি মন্ত্রণালয়ের সৎ কর্মকর্তারাও। এই বিষয়ে
সাধারণ ভূমি সেবাগ্রহীতা এবং সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ কানুনগোর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক তাঁর অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের জোর দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সালেকুল ইসলামের বিধি বহির্ভূত বদলি নিয়োগ প্রসঙ্গ ও কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ভূমি সেবার নামে দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ উঠার বিষয় তার বক্তব্য জানতে সরাসরি তার সাথে যোগাযোগ করে এই বিষয়ে তার মুখোমুখি হলে তিনি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তরের জনৈক সচিবের নাম ভাঙ্গিয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের নানান কথা বলে বিভ্রান্ত করছেন। তার সমস্ত কথার রেকর্ডিং সংরক্ষিত আছে। অবৈধ সম্পদ এবং ঘুষ দুর্নীতির বিষয়ে তিনি কথা বললে তিনি এই বিষয়টি বারবার এগিয়ে যান।
এদিকে গুলশান সহকারি কমিশনার ( ভূমি) রাজস্ব সার্কেলের কানুনগো সালেকুল ইসলামের বিধি বহির্ভূত বদলি নিয়োগের বিষয়ে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান কানুনগো সালেকুল ইসলামের বদলি নিয়োগের বিষয়টি তাঁর কার্যালয় থেকে হয়নি। এই বিষয়টি তিনি অবগত নন । এই কানুনগো পদোন্নতি পাওয়ার পর কিভাবে গুলশানে নিয়োগ বদলি নিয়েছেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার তা জানেন না বলে জানান।



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত