ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ৫:২৬ পিএম

ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করতে রিয়াদ একাধিক পরিকল্পনা বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয়জন ব্যক্তির মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে। ইয়েমেনের মাটিতে সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে থাকা স্থানীয় বাহিনী মূল স্থল অভিযান পরিচালনা করবে। তাদের সহায়তায় হামলা চালাবে সৌদি বিমানবাহিনী।
তবে সৌদির মিত্ররা সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশও সৌদিকে মূলত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে।
অভিযানের জন্য দুটি পরিকল্পনা
উপসাগরীয় ও ইয়েমেনি কর্মকর্তাদের মতে, সৌদি কর্মকর্তারা সম্ভাব্য অভিযানের জন্য দুটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন।
প্রথম পরিকল্পনায় বাব আল-মানদেব প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় সীমিত পরিসরে অভিযান চালানোর কথা রয়েছে। দ্বিতীয় পরিকল্পনাটি আরও বিস্তৃত। এতে আল-বাইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ প্রদেশে একই সময়ে সমন্বিত হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অভিযানের পরিসর অনুযায়ী এক লাখের বেশি ইয়েমেনি যোদ্ধাকে এতে মোতায়েন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে অভিযান ঠিক কবে শুরু হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। সম্ভাব্য সময়সীমা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে থেকে শুরু করে নভেম্বরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত বিস্তৃত বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত ছয় ব্যক্তি।
এ বিষয়ে সৌদি ও ইয়েমেন সরকার, হুতি গোষ্ঠী এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্রদের মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব
বাব আল-মানদেব প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ। ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক।
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি হুতিরা উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে বাব আল-মানদেবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় সৌদি আরব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। গত মাসে হুতিদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করাই সম্ভাব্য সৌদি অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এক পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় এক কর্মকর্তার মতে, বাব আল-মানদেব হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে তাদের সঙ্গে নতুন করে ইয়েমেন শান্তি আলোচনা শুরু করা কঠিন বলে মনে করছে রিয়াদ। কারণ, প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৌশলগত প্রভাব ও চাপ প্রয়োগের সুযোগ বাড়িয়েছে।
২০১৫ সালের যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি চায় না রিয়াদ
২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে সৌদি আরব। সে সময় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে একটি আরব জোটের নেতৃত্ব দেয় রিয়াদ। হুতিরা তখন রাজধানী সানা দখল করে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।
২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা বেশির ভাগ সময় মোটামুটি টিকে ছিল। তবে চলতি বছর ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। হুতিরা সৌদি আরবের জাহাজ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সৌদি আরব বিশেষজ্ঞ মাইকেল র্যাটনির মতে, এবার সৌদি অভিযান তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরের হতে পারে। ২০১৫ সালের মতো ব্যাপকভাবে হুতিদের পরাজিত করার চেষ্টা এবার নাও করা হতে পারে।
তার মতে, হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করার পাশাপাশি বাব আল-মানদেবের উপকূলীয় এলাকায় আগের পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনাও সৌদি আরবের লক্ষ্য হতে পারে। সে ক্ষেত্রে উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখল করে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করতে সীমিত অভিযান চালানো হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভূমিকা
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। এক পশ্চিমা কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন সৌদি বিমান অভিযানে সহায়তার জন্য সামরিক উপদেষ্টা এবং লক্ষ্য নির্ধারণসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে।
তবে এই সহায়তার পরিধি সীমিত হতে পারে। রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি বিমান হামলাসহ সামরিক সহায়তা চাইলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে সাড়া দেননি।
অন্যদিকে, গত মাসে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করা তুরস্ক ও পাকিস্তানও রিয়াদকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা।
এক পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তা জানান, গত মাসে পাকিস্তান চারটি কার্গো বিমানে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এডেন বন্দরে পাঠিয়েছে।
পাকিস্তানি এক কর্মকর্তা, এক উপসাগরীয় কর্মকর্তা ও এক পশ্চিমা কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইয়েমেনে অবস্থান করছেন এবং স্থানীয় ইয়েমেনি বাহিনীকে সহায়তা করছেন। সৌদি আরবের আগে কেনা তুরস্কের তৈরি ড্রোনও ইয়েমেনের আকাশে মোতায়েন করা হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
ইয়েমেনে সেনা পাঠাবে না পাকিস্তান
সম্ভাব্য নতুন অভিযানে সৌদি আরবের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো—হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে দেশটির তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে।
আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, এ বিষয়ে রিয়াদ কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চেয়েছে।
পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের স্থলসীমান্ত সুরক্ষা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পাকিস্তান ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। গত বছর থেকে কয়েক দফায় এসব সেনা সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনা বাড়ার পরও নতুন করে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত ইসলামাবাদ নেয়নি বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে সামরিক সহায়তার বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে, লোহিত সাগরের বন্দরনগরী ইয়ানবু সুরক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।
হুতিবিরোধী ইয়েমেনি বাহিনী কতটা প্রস্তুত?
সম্ভাব্য স্থল অভিযান বাস্তবায়নে সৌদি আরবকে ইয়েমেনের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ও পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয়হীন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করতে হবে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি ও বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য এসব বাহিনী কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশার মতে, অনেক হুতিবিরোধী বাহিনী এখনও দীর্ঘস্থায়ী অভিযানের জন্য যথেষ্ট সংগঠিত বা প্রস্তুত নয়। ফলে সুসংগঠিত হুতি বাহিনীকে পিছু হটাতে তাদের সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
গত শীতেও হুতিবিরোধী ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর মধ্যে বিভাজন আরও গভীর হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় যোদ্ধারা পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকা দখল করে পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ঘোষণা করলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। কয়েক দফা লড়াইয়ের পর দক্ষিণাঞ্চলীয় বাহিনী পরাজিত হয়।
অভিযানের সাফল্য নির্ভর করবে স্থানীয় বাহিনীর ওপর
সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দেশটির সরকারি নীতিনির্ধারণী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আলি শিহাবি সতর্ক করে বলেছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযানের ফলাফল অনেকাংশে ইয়েমেনের স্থলবাহিনীগুলোর সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।
তার ভাষ্য, এত দিন এসব বাহিনীর অগ্রাধিকার ছিল নিজেদের অবস্থান রক্ষা করা এবং বিভিন্ন ফ্রন্ট স্থিতিশীল রাখা। এখন তারা আক্রমণাত্মক অভিযানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইরান ও ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাড়তে থাকা ঝুঁকির মধ্যে সৌদি আরবের সম্ভাব্য এই অভিযান ইয়েমেন সংঘাতের নতুন পর্যায় তৈরি করতে পারে। হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান হলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সংঘাতের আরেকটি কেন্দ্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত