ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ৪:২৪ পিএম

সংগৃহীত ছবি
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় বিপুল সম্পদ সৃষ্টির পরও হাজারো মানুষের রাত কাটে ফুটপাতে, তাঁবুতে কিংবা গাড়ির ভেতর। আবাসনসংকট, আয়বৈষম্য ও সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহির এই বাস্তবতা বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে।
বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ক্যালিফোর্নিয়া প্রযুক্তি, বিনোদন ও উদ্ভাবনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিবিপ্লব, হলিউডের জৌলুশ এবং বিপুল সম্পদ সৃষ্টির মধ্যেও রাজ্যটির হাজারো মানুষকে রাত কাটাতে হয় ফুটপাতে, তাঁবুতে কিংবা গাড়ির ভেতর।
এই বৈপরীত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—অর্থনীতি যত বড় হয়, মানুষের জীবন কি ততটাই নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ হয়?
ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর মানুষের জীবনমানের উন্নতি সব সময় সমানতালে এগোয় না। আবাসনের উচ্চ ব্যয়, আয়বৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্যসংকট, মাদকাসক্তি এবং সরকারি কর্মসূচির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে না পারার মতো বিষয় পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ফারুক আহমেদের বিশ্লেষণধর্মী লেখায় উঠে এসেছে, ক্যালিফোর্নিয়ার এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক। দ্রুত নগরায়ণ, আবাসনসংকট এবং সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাজ্যটির অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।
সমৃদ্ধ অর্থনীতি, তবু মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই
ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনৈতিক উৎপাদনের পরিমাণ ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। প্রযুক্তি, বিনোদন, কৃষি, উৎপাদনশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থায়ন ও পেশাগত সেবাসহ বিভিন্ন খাত রাজ্যটির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে বিবেচনা করলে ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর অন্যতম।
কিন্তু অর্থনীতির বিশাল আকার সেখানকার প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না। জিডিপি বাড়লেও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী সময়মতো বাড়িভাড়া দিতে পারছেন কি না, একজন পণ্য সরবরাহকারী অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারবেন কি না কিংবা সাময়িকভাবে আয় বন্ধ হয়ে গেলে একটি পরিবার কত দিন টিকে থাকতে পারবে—এসব প্রশ্নের উত্তর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে পাওয়া যায় না।
অর্থনীতির উৎপাদন বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধান বাড়তে থাকলে প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। ক্যালিফোর্নিয়ার আবাসনসংকট এই বাস্তবতারই একটি প্রকট উদাহরণ।
আবাসনসংকট যেভাবে মানুষকে রাস্তায় ঠেলে দেয়
ক্যালিফোর্নিয়ায় গৃহহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ আবাসনের উচ্চ ব্যয় এবং চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত বাড়ির অভাব। রেস্তোরাঁ, দোকান, হাসপাতাল ও পণ্য সরবরাহের মতো খাতে কাজ করা অনেক মানুষের পক্ষে কর্মস্থলের কাছাকাছি বাসা ভাড়া নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
মাসিক আয়ের বড় অংশ বাড়িভাড়ায় ব্যয় হলে সঞ্চয়ের সুযোগ কমে যায়। ফলে গাড়ি মেরামত, চিকিৎসা ব্যয় কিংবা কয়েক দিনের জন্য কাজ হারানোর মতো ঘটনাও একটি পরিবারকে ঋণগ্রস্ত করতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বাসস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
আবাসন নির্মাণের বিধিনিষেধও এই সংকটকে জটিল করে তোলে। অনেক এলাকায় জমির ব্যবহার, ভবনের উচ্চতা ও ঘনত্ব নিয়ে কঠোর নিয়ম রয়েছে। অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। কোথাও নতুন বহুতল ভবন কিংবা সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের বিরোধিতা করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিজের এলাকায় নতুন আবাসন বা উন্নয়ন প্রকল্প না চাওয়ার এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘নিমবি’ (NIMBY—Not In My Backyard)।
ফলে কর্মসংস্থানের কেন্দ্রগুলোতে বাড়ির চাহিদা বাড়লেও সেই অনুপাতে আবাসন তৈরি হয় না। উচ্চ আয়ের মানুষ সীমিতসংখ্যক বাড়ির জন্য বেশি ভাড়া দিতে সক্ষম হন। অন্যদিকে, স্বল্প আয়ের কর্মীদের ছোট ও জনাকীর্ণ বাসায় থাকতে হয়, দূরবর্তী এলাকা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কাজে যেতে হয়, কিংবা গাড়ি ও অস্থায়ী আশ্রয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।
ঢাকাসহ বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোর জন্য এই অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আবাসনকে শুধু ব্যক্তিগত সম্পত্তি কেনাবেচার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামোরও অংশ।
কর্মসংস্থানের কেন্দ্রের কাছাকাছি সাশ্রয়ী বাসস্থান না থাকলে মানুষের যাতায়াতের সময় ও ব্যয় বাড়ে। একই সঙ্গে যানজট, পরিবহনব্যয় এবং নাগরিক সেবার ওপর চাপও বৃদ্ধি পায়। তাই নগর উন্নয়নের পরিকল্পনায় সাশ্রয়ী আবাসন, গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা সমন্বিত করা জরুরি।
প্রবৃদ্ধির সুফল পাচ্ছে কারা?
ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনৈতিক শক্তির বড় উৎস সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান, হলিউডের বিনোদনশিল্প, কৃষি, জীবপ্রযুক্তি, মহাকাশ ও উড়োজাহাজশিল্প এবং উন্নত উৎপাদন খাত। এসব শিল্প বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে রাজ্যটির প্রভাব বাড়িয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মানেই সবার জীবনযাত্রার মান একই হারে উন্নত হওয়া নয়। উচ্চ আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে সীমিত আবাসনের জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হতে পারে। বাড়ির মালিকেরা বেশি ভাড়া দিতে সক্ষম এমন ভাড়াটিয়াকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন। ফলে সম্পত্তির মূল্য ও ভাড়া সাধারণ কর্মজীবী মানুষের আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশেও জমি ও আবাসনের দাম মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের পাশাপাশি আবাসন, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বেড়ে গেলে পরিবারগুলোর হাতে প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর অর্থ কমে যেতে পারে।
অর্থাৎ, শহরের সামগ্রিক সম্পদ বাড়লেও তার বাসিন্দাদের জীবন আরও অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে উন্নয়নের সাফল্য পরিমাপে জিডিপি ও বিনিয়োগের পাশাপাশি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা, আবাসনের নিরাপত্তা এবং মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকারের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সরকারি অর্থ ব্যয় করলেই কি সংকট কমে?
ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সামাজিক খাতে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি সেই অর্থের ব্যবহার ও ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেট অডিটরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে গৃহহীনতা ও আবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব কর্মসূচির ব্যয় ও কার্যকারিতা ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল।
নিরীক্ষায় পর্যালোচনা করা পাঁচটি কর্মসূচির মধ্যে দুটি ব্যয়-সাশ্রয়ী বলে প্রতীয়মান হয়। অন্য তিনটি কর্মসূচি কতটা কার্যকর ছিল, তা মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত ফলাফলসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যদি সরকার নিশ্চিতভাবে বলতে না পারে কতজন মানুষ স্থায়ী আবাসন পেয়েছেন, কতজন সেই বাসস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন এবং কোন কর্মসূচি সবচেয়ে কার্যকর হয়েছে, তাহলে সেই ব্যয় থেকে বাস্তব সুফল কতটা পাওয়া গেল?
সরকারি অর্থের কার্যকারিতা শুধু বরাদ্দের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। অর্থ কোথায় ও কী উদ্দেশ্যে ব্যয় হয়েছে, কতজন উপকৃত হয়েছেন এবং দীর্ঘ মেয়াদে কী পরিবর্তন এসেছে—এসবের নির্ভরযোগ্য হিসাব থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশেও বড় সামাজিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, স্বচ্ছ বাজেট, নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ, ডিজিটাল ব্যয় অনুসরণব্যবস্থা এবং স্বাধীন মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্পের অগ্রগতি শুধু অর্থ ছাড় বা নির্মাণকাজের পরিমাণ দিয়ে নয়, মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে, তা দিয়েও পরিমাপ করতে হবে।
প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, একই ধরনের কর্মসূচির পুনরাবৃত্তি এবং পরিচালন ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা দরকার। এসব কারণে অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত সামাজিক সুফল নাও পাওয়া যেতে পারে।
এনজিওর ভূমিকা থাকবে, জবাবদিহি সরকারের
গৃহহীনতা ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা, ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছানো, পুনর্বাসন এবং বিশেষায়িত সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব।
তবে সেবা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এনজিও বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা মানেই সরকারি জবাবদিহির দায়িত্বও তাদের কাছে ছেড়ে দেওয়া নয়। জননীতি নির্ধারণ, সেবার মানদণ্ড স্থাপন, অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ফলাফল মূল্যায়নের দায়িত্ব সরকারেরই।
একাধিক প্রতিষ্ঠান বা ঠিকাদারের মাধ্যমে অর্থ ব্যয় হলে হিসাবের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে কত অর্থ গেছে, কী সেবা দেওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে কতজন সেই সেবা পেয়েছেন এবং কী ফল পাওয়া গেছে—এসব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া না গেলে পুরো কর্মসূচির কার্যকারিতা নিরূপণ কঠিন হয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার নিরীক্ষায় উঠে আসা তথ্যের তাৎপর্য হলো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসূচি পরিচালিত হলেও ফলাফল মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক তথ্য থাকা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের জন্য নীতিটি পরিষ্কার: সরকার সেবা প্রদানে অংশীদার নিতে পারে, কিন্তু জনগণের অর্থের হিসাব ও ফলাফলের দায় এড়াতে পারে না।
গৃহহীনতা, মাদকাসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্য
গৃহহীনতার সংকটকে শুধু বাসস্থানের অভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে দারিদ্র্য, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি এবং মাদকাসক্তির মতো বিষয়ও জড়িয়ে থাকতে পারে। তবে সব গৃহহীন মানুষ মাদকাসক্ত কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন—এমন ধারণা সঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে আবাসনের ব্যয় বহন করতে না পারা কিংবা আকস্মিক আর্থিক বিপর্যয়ও মানুষকে গৃহহীন করে তোলে।
মাদকাসক্তি কারও আয়, স্বাস্থ্য ও পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আবার রাস্তায় বসবাসের অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ মাদকনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা এবং চিকিৎসা নেওয়ার পথ কঠিন করে তুলতে পারে। ফলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা পরস্পরকে আরও গভীর করে।
যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিলের মতো শক্তিশালী মাদক নিয়ে উদ্বেগ এ আলোচনাকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। মাদকনির্ভরতার ঝুঁকি মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন জরুরি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মাদককে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে পূর্ণাঙ্গ সমাধান পাওয়া কঠিন হবে। মাদক পাচার ও সরবরাহের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক শিক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, পারিবারিক সহায়তা এবং কর্মসংস্থানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
অপরাধ দমন ও পুনর্বাসনের মধ্যে ভারসাম্য
গৃহহীনতা, মাদকাসক্তি ও অপরাধের সম্পর্ক নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটিই এই বিতর্কের অন্যতম প্রধান বিষয়।
২০১৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা ‘প্রপোজিশন ৪৭’ অনুমোদন করেন। এর মাধ্যমে কিছু স্বল্পমূল্যের চুরি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তির ধরন পরিবর্তন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দোকান থেকে চুরি, পুনরাবৃত্ত অপরাধ এবং জননিরাপত্তার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
এসব উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালে ভোটাররা ‘প্রপোজিশন ৩৬’ অনুমোদন করেন। ‘হোমলেসনেস, ড্রাগ অ্যাডিকশন অ্যান্ড থেফট রিডাকশন অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু পুনরাবৃত্ত চুরি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির সুযোগ বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে কিছু মাদকসংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য আদালতের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।
এই বিধানের আওতায় নির্দিষ্ট পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড থাকলে ৯৫০ ডলার বা তার কম মূল্যের সম্পদ চুরির কিছু ঘটনাও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট মাদকসংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা কর্মসূচি সফলভাবে শেষ করলে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খারিজ হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে আনে। অপরাধের পুনরাবৃত্তি ও জননিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করলে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে পারে। আবার কেবল কঠোর শাস্তির ওপর নির্ভর করে মাদকনির্ভরতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা কিংবা গৃহহীনতার মতো জটিল সংকটের স্থায়ী সমাধান করাও কঠিন।
তাই অপরাধ দমন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। সংগঠিত মাদক পাচার, সহিংস অপরাধ এবং পুনরাবৃত্ত গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ জরুরি। একই সঙ্গে মাদকনির্ভরতা থেকে মুক্তি এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও এই ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা যেমন মূল্যায়ন করতে হবে, তেমনি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি অপরাধের পুনরাবৃত্তি কমাতে কতটা ভূমিকা রাখছে, সেটিও তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য ছয়টি করণীয়
ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।
১. আবাসনকে নগর উন্নয়নের কেন্দ্রীয় বিষয় করতে হবে
শহরের জনসংখ্যা ও কর্মসংস্থান বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে তুলতে হবে। শুধু বাড়ি নির্মাণ নয়, কর্মস্থল, গণপরিবহন ও নাগরিক সেবার সঙ্গে আবাসনের সংযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
২. প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের জীবনমান বিবেচনা করতে হবে
জিডিপি, রপ্তানি ও বিনিয়োগের পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোই উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা, বাসস্থানের নিরাপত্তা এবং মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকারের বিষয়গুলোও উন্নয়ন মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।
৩. সরকারি ব্যয়ের ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে
সামাজিক খাতে কত অর্থ বরাদ্দ হয়েছে, তার পাশাপাশি কতজন উপকৃত হয়েছেন এবং কী দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন এসেছে, তা পরিমাপ করতে হবে। নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে।
৪. এনজিও ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে জবাবদিহি বজায় রাখতে হবে
সেবা প্রদানে অংশীদারত্ব কার্যকর হতে পারে। তবে অর্থের হিসাব, মান নিয়ন্ত্রণ ও ফলাফল মূল্যায়নের দায়িত্ব সরকারের কাছে থাকতে হবে।
৫. মাদকাসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এতে সংকটের গভীরে থাকা কারণগুলো মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হবে।
৬. অপরাধ দমন ও পুনর্বাসনকে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাদকনির্ভরতা থেকে মুক্তি, চিকিৎসা এবং কর্মজীবনে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করতে হবে। কোন পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে, তা তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
উন্নয়নের চূড়ান্ত মানদণ্ড মানুষ
ক্যালিফোর্নিয়াকে ব্যর্থ অর্থনীতি বলা যাবে না। বরং রাজ্যটির বিপুল উৎপাদনক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি গৃহহীনতার সংকটের উপস্থিতিই বিষয়টিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। অর্থনৈতিক শক্তি, উদ্ভাবন ও সম্পদ সৃষ্টি মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে; কিন্তু এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবার জন্য আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।
বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তাটি ক্যালিফোর্নিয়ার মতো হয়ে ওঠার ভয় নয়; বরং এমন উন্নয়নপথ অনুসরণ করা, যেখানে নগরায়ণ ও সম্পদের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা এবং সরকারি জবাবদিহি এগিয়ে যায়।
বাংলাদেশের সামনে এখনও পরিকল্পিত নগরায়ণ, সাশ্রয়ী আবাসন, কার্যকর সামাজিক কর্মসূচি এবং স্বচ্ছ সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে উন্নয়ন পরিকল্পনায় মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন শুধু সম্পদশালী গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সাধারণ কর্মজীবী মানুষের জীবনেও নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিয়ে আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত একটি অর্থনীতির সাফল্য শুধু তার জিডিপির আকার, রপ্তানি আয় কিংবা বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মুনাফা দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, একজন সাধারণ কর্মজীবী তার আয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারছেন কি না, নিরাপদ বাসস্থানে থাকতে পারছেন কি না এবং অসুস্থতা বা আকস্মিক আর্থিক বিপর্যয়ে পড়লে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন কি না।
বিশ্বের অন্যতম ধনী অর্থনীতির একটি অঙ্গরাজ্যে মানুষকে যখন রাত কাটানোর জন্য ফুটপাতে তাঁবু খাটাতে হয়, তখন সেই দৃশ্য উন্নয়নের ধারণাকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটি স্পষ্ট—সমৃদ্ধির লক্ষ্য শুধু সম্পদ বাড়ানো নয়, মানুষের নিরাপদ, স্বচ্ছন্দ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাও।



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত