নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ৬:৪০ পিএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটির নিচের গ্যাস দিয়ে সচল হচ্ছে দেশের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অর্থনীতির চাকা। অথচ গ্যাসসম্পদে সমৃদ্ধ এই জেলার অনেক মানুষই এখনো গ্যাস সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এ বৈষম্য দূর করে জেলার ৯টি উপজেলায় গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণ, নতুন গ্যাস অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ তিতাস গ্যাসক্ষেত্র। কসবা উপজেলায় রয়েছে সালদা নদী গ্যাসক্ষেত্র। এ ছাড়া মেঘনা গ্যাস কূপ এবং বাঞ্ছারামপুর ও নবীনগর উপজেলার বাঙ্গরা হাজিপুরেও রয়েছে গ্যাস কূপ।
পেট্রোবাংলার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু তিতাস গ্যাসক্ষেত্র থেকেই দেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ সরবরাহ করা হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্যাসসম্পদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে জেলার সম্পদ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখছে, সেই জেলার মানুষেরই গ্যাস সুবিধা না পাওয়ার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার জনসংখ্যা ৩৩ লাখের বেশি। ৯টি উপজেলা, ৫টি পৌরসভা ও ১০১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ জেলার বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জ্বালানি সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের প্রশ্ন, জাতীয় অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখার পরও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের জন্য পরিকল্পিত গ্যাস সুবিধা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে না কেন?
এদিকে দেশে গ্যাসের চাহিদা ও দেশীয় উৎপাদনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। ঘাটতি পূরণে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সম্পদসমৃদ্ধ জেলাগুলোর উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।
এ লক্ষ্যে সরকারের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—জেলার গ্যাস সুবিধাবঞ্চিত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে পূর্ণাঙ্গ সরকারি জরিপ পরিচালনা, ৯টি উপজেলায় পর্যায়ক্রমে গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণে বাস্তবসম্মত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ এবং তিতাস ও সালদা গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে নতুন কূপ খনন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।
পাশাপাশি তারাপুর ও কাশিরামপুরসহ সম্ভাবনাময় এলাকায় ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও নতুন গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জেলার শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জ্বালানি সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দাবির পক্ষে স্থানীয়দের বক্তব্য, এটি অন্য কোনো জেলার মানুষের অধিকারের বিরুদ্ধে নয়; বরং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ন্যায্য উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর দাবি। জাতীয় সম্পদের ওপর স্থানীয়দের একচ্ছত্র মালিকানা নয়, বরং সম্পদের সুষম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পদসমৃদ্ধ এলাকার মানুষও যেন উন্নয়নের ন্যায্য সুফল পায়, সেটিই তাদের প্রত্যাশা।
এ দাবিকে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের একক দাবি হিসেবে না দেখে জেলার সর্বস্তরের মানুষের জনদাবি হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তথ্য, যুক্তি ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে গুজব, অপপ্রচার ও ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে আধুনিক, শিল্পসমৃদ্ধ ও কর্মসংস্থানমুখী মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। স্থানীয়দের জোরালো দাবি, তিতাস ও সালদা গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়ন, নতুন গ্যাস অনুসন্ধান এবং জেলার মানুষের জন্য গ্যাস সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর ও সময়বদ্ধ মহাপরিকল্পনা নিতে হবে। ৩৩ লাখের বেশি মানুষের উন্নয়ন ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে এ দাবিতে জেলার সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত