ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ২২ অগাস্ট ২০২৬ | ১২:১৪ পিএম

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক চাপ সামলাতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ সরিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন। এতে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতার মুখে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও অংশীদারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
সর্বশেষ, জাপান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন। দীর্ঘ প্রায় নয় মাস ধরে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে প্রতিস্থাপন করতেই এটি পাঠানো হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
জর্জ ওয়াশিংটন এশিয়া ছাড়ার ফলে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরির উপস্থিতি আপাতত শূন্য হয়ে গেছে। বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগের, কারণ একই সময়ে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের নৌ ও কোস্টগার্ড তৎপরতা বাড়ছে।
দীর্ঘ মোতায়েনে চাপে মার্কিন নৌসেনারা
আব্রাহাম লিংকন টানা প্রায় নয় মাস মোতায়েন থাকার পর জাহাজটিতে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। খাদ্যসংকট, ভাঙা টয়লেট ও গোসলের ব্যবস্থার কারণে নাবিকদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। এমনকি এক নাবিক জাহাজ থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও খবর রয়েছে।
এ কারণে লিংকনের পরিবর্তে জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠানো হলেও এর ফলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি সক্ষমতা সাময়িকভাবে কমে গেছে।
চীনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কি দুর্বল হচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়া থেকে মার্কিন রণতরি সরিয়ে নেওয়া বৃহত্তর সামরিক পুনর্বিন্যাসের অংশ। চলতি বছরের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন থাকা টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ব্যবস্থার কিছু অংশও ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়।
একই সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াংয়ের মতে, এসব পদক্ষেপ চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এশিয়ায় আরও সক্রিয় চীন
যুক্তরাষ্ট্রের রণতরি এশিয়া ছাড়ার সময় চীনা নৌবাহিনীও প্রথম দ্বীপমালার বাইরে নিজেদের কার্যক্রম বাড়াচ্ছে। চীনের লিয়াওনিং ও শানডং বিমানবাহী রণতরি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে নিয়মিত তৎপরতা চালাচ্ছে।
ইয়াংয়ের মতে, গত জুন থেকে তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় জলসীমায় চীনা কোস্টগার্ডের তৎপরতাও বেড়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চীন শুধু তাইওয়ান, জাপান বা ফিলিপাইনকেই চাপ দিচ্ছে না; একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এবং দ্রুত সামরিক জবাব দেওয়ার সক্ষমতাও যাচাই করছে।
চীনকে নিয়ে বাড়ছে মিত্রদের উদ্বেগ
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জা ইয়ান চং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার ফলে চীন আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে মার্কিন মিত্রদের মধ্যে।
তবে তার মতে, রণতরি সরিয়ে নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নমনীয়তা কিছুটা কমলেও এশিয়ায় এখনও বিপুল মার্কিন সেনা ও সামরিক সম্পদ রয়েছে। ফলে এটি পুরোপুরি মার্কিন সামরিক প্রত্যাহার নয়।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার সামরিক ও বেসামরিক কর্মী রয়েছে। এর বড় অংশই জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন।
প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে এশিয়ার মিত্ররা
ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা নিজেদের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে আরও বড় দায়িত্ব নিক। ২০২৬ সালের ন্যাশনাল ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিতেও মিত্রদের সঙ্গে দায়িত্ব ভাগাভাগির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও তাইওয়ান নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তাইওয়ান ২০২৭ সালে প্রতিরক্ষা ব্যয় ১৮ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ফিলিপাইনও চীনের মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৪ শতাংশে উন্নীত করার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়া থেকে মার্কিন সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা অঞ্চলটির দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে উৎসাহিত করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এশিয়া ছাড়ছে না যুক্তরাষ্ট্র
তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরে যাচ্ছে—এমনটা মনে করছেন না বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ।
তাইওয়ান ও জাপানের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িকভাবে সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ এশিয়াতেই রয়েছে।
ন্যাশনাল ব্যুরো অব এশিয়ান রিসার্চের অনাবাসিক ফেলো কে ট্রিস্টান ট্যাংয়ের মতে, এশিয়ায় এখনও গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপও রয়েছে, যেগুলো এফ-৩৫বি স্টেলথ যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন ছোট আকারের বিমান পরিচালনা করতে পারে।
ট্রাম্পের কাছে শেষ পর্যন্ত চীনই অগ্রাধিকার?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও চীনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
ট্রিস্টান ট্যাংয়ের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই বিবেচনায় চীনই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ফলে ইরান যুদ্ধের কারণে কিছু মার্কিন সামরিক সম্পদ সাময়িকভাবে এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হলেও ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদে চীনকে মোকাবিলার কৌশল থেকে সরে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছাচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
তবে ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, একাধিক ফ্রন্টে মার্কিন সামরিক সম্পদ ব্যবহারের চাপও তত বাড়বে। আর সেই চাপ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতার টানাপোড়েনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত