ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ২৩ অগাস্ট ২০২৬ | ১:১৯ পিএম

সংগৃহীত ছবি
বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর কানাডাকে নিয়ে ফের কড়া মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য না হয়েও অঙ্গরাজ্য হওয়ার সুবিধা নিতে চায়।
শনিবার এ মন্তব্য করেন ট্রাম্প। এর আগে শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যায়। এরপর কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন করে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প বলেন, ‘কানাডা একটি অঙ্গরাজ্য না হয়েও অঙ্গরাজ্য হওয়ার সুবিধা চায়।’ একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর কানাডার কৃষকদের ওপর বিপুল পরিমাণ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের এ মন্তব্য তার দীর্ঘদিনের কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে তিনি একাধিকবার এমন মন্তব্য করে আসছেন। এতে কানাডার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
‘আমরা আক্রান্ত হয়েছি, তাই বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে’
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নতুন মার্কিন শুল্ককে ‘ভুল হিসাব’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। শনিবার জনগণের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের লক্ষ্য কানাডাকে দুর্বল ও বিভক্ত করা।
কার্নি বলেন, ‘তারা অনেক বেশি চেয়েছে এবং বিনিময়ে খুব কম প্রস্তাব দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যখন আক্রান্ত হন, তখন যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। আমরা আক্রান্ত হয়েছি।’
কার্নি জানান, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্কের সমপরিমাণ শুল্ক কানাডাও ‘ডলার-ফর-ডলার’ ভিত্তিতে আরোপ করবে। ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি সরঞ্জাম ও ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্য এর আওতায় থাকতে পারে।
তবে তিনি বলেন, কানাডা প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করতে চায়নি। দেশের স্বার্থ সুরক্ষার প্রয়োজনেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। পাল্টা ব্যবস্থার বিস্তারিত আগামী কয়েক দিনের মধ্যে জানানো হবে।
যেসব পণ্যে নতুন শুল্ক
নতুন ৫০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক কানাডা থেকে আমদানি করা নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর কার্যকর হবে। এর পাশাপাশি কানাডার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি ও কাঠজাত পণ্যের ওপর আগে থেকে থাকা মার্কিন শুল্কও বহাল থাকবে।
নতুন শুল্কে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় পণ্য প্রভাবিত হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট আমদানির প্রায় ৫ শতাংশ।
এর আওতায় রয়েছে—ওয়াইন ও অন্যান্য পানীয়, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক, হকি সরঞ্জাম ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য।
কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের নেতারাও কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পোয়ালিয়েভরিও নতুন মার্কিন শুল্ককে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
কেন ভেঙে গেল আলোচনা?
দুই দেশের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। চলতি সপ্তাহের শুরুতেও সমঝোতার বিষয়ে আশাবাদ ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে গিয়ে নতুন শর্ত দেওয়ার অভিযোগ তোলে।
কানাডার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র শেষ মুহূর্তে এমন কিছু পরিবর্তন আনে, যা দেশটির জন্য অন্যায্য ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।
কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু শর্ত দিয়েছিল, যা কানাডার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কানাডার নতুন বাণিজ্য চুক্তি করার সক্ষমতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি।
অন্যদিকে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার অভিযোগ করেছেন, কানাডা আগে সম্মত হওয়া শর্ত থেকে সরে গিয়ে নতুন দাবি তুলেছে। তিনি জানান, আপাতত কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা পুনরায় শুরুর কোনো পরিকল্পনা নেই।
‘অর্থনৈতিকভাবে ৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হওয়ার আশঙ্কা
অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড কার্নির অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘তাকে বিশ্বাস করা যায় না।’
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড এবিও যুক্তরাষ্ট্রের দাবির সমালোচনা করেছেন। তার মতে, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য চুক্তির ক্ষমতা সীমিত করা হলে দেশটি ‘অর্থনৈতিকভাবে ৫১তম অঙ্গরাজ্যে’ পরিণত হবে।
কুইবেকের প্রিমিয়ার ক্রিস্টিন ফ্রেশেত নতুন মার্কিন শুল্কের কারণে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোকে সহায়তায় প্রাদেশিক সরকার পদক্ষেপ নেবে বলেও জানান তিনি।
তবে তেলসমৃদ্ধ আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ দুই পক্ষকেই আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইউএসএমসিএ নিয়েও অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ায় উত্তর আমেরিকার বৃহত্তর বাণিজ্য কাঠামো নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান ইউএসএমসিএ চুক্তির বাধ্যতামূলক পর্যালোচনাও চলছে। তিন দেশের মধ্যে বছরে প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের ভিত্তি এই চুক্তি।
শুক্রবারের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার প্রভাব ইউএসএমসিএতে পড়বে কি না—এমন প্রশ্নে কার্নি বলেন, ‘এটি অবশ্যই ভালো খবর নয়।’
দীর্ঘদিনের বাণিজ্য টানাপোড়েনের মধ্যে নতুন করে শুল্ক আরোপ ও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণায় উত্তর আমেরিকার দুই ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদারের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আপাতত দুই পক্ষই কঠোর অবস্থানে থাকায় দ্রুত সমঝোতার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত।
সূত্র: বিবিসি



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত