ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৫:৩৬ পিএম

সংগৃহীত ছবি
কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রথম ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ করার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন।
বুধবার ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বার্ষিক ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে তিনি কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার এ প্রস্তাব দেন। এ সময় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি পার্লামেন্টে উপস্থিত ছিলেন। বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে তার ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
ফন ডার লায়েন বলেন, কানাডাকে ইইউর প্রথম ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ করার পথ উন্মুক্ত করতে তিনি প্রধানমন্ত্রী কার্নির সঙ্গে কাজ করতে চান। তার ভাষ্য, এটি কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে জোট গঠনের উদ্যোগ নয়; বরং ইউরোপ ও কানাডার অভিন্ন শক্তি বাড়ানোর প্রচেষ্টা।
তবে ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ নামে কোনো মর্যাদা বর্তমানে ইইউর চুক্তিতে নেই। ফলে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে কানাডার সঙ্গে ইইউর সম্পর্কের জন্য নতুন একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে। এ ব্যবস্থার বিস্তারিত রূপ এখনও নির্ধারিত হয়নি এবং এর জন্য ইইউ সদস্যদেশগুলোর সম্মতির প্রয়োজন হতে পারে।
বাণিজ্য থেকে প্রতিরক্ষা—বিস্তৃত সহযোগিতার পরিকল্পনা
ফন ডার লায়েন বলেন, ইইউ ও কানাডা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনীতি, প্রতিরক্ষা, কাঁচামাল ও সরবরাহব্যবস্থার মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনেকটা অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।
ইউক্রেন, প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও সরবরাহব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইউরোপ ও কানাডা একসঙ্গে কাজ করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। গণতন্ত্রের প্রতি দুই পক্ষের অঙ্গীকার তাদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বলেও জানান ফন ডার লায়েন।
ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ব্যাটারি, এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা তুলে ধরেন তিনি। সাম্প্রতিক আলোচনায় প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং আর্কটিক অঞ্চল নিয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা উঠে এসেছে।
ইইউ ও কানাডার মধ্যে ইতোমধ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে সেই বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত করার লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন
কানাডাকে ঘিরে ইইউর এই উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে অটোয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রভাবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি সম্প্রতি ইইউর সঙ্গে একটি ‘অনন্য জোট’ গড়ে তোলার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি পূর্ণ সদস্যপদের পরিবর্তে বিশেষ ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের উদ্যোগও নিয়েছে অটোয়া।
কানাডার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করা বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ কারণেই কার্নির ১৫ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর ইউরোপ সফরের কর্মসূচিতে স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বক্তব্য দেওয়া এবং ইইউর ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে উপস্থিত থাকার বিষয়টি রাখা হয়েছে।
‘কারও বিরুদ্ধে নয়’—বার্তা ব্রাসেলসের
কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে কোনো বিরোধী জোট গঠনের উদ্যোগ নয়—এমন বার্তাই দিয়েছেন ফন ডার লায়েন।
তিনি বলেন, ইউরোপের অংশীদারত্বগুলো কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়। একই সঙ্গে পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ইউরোপের অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার প্রয়োজন রয়েছে।
ফন ডার লায়েনের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ না করা হলেও তার মন্তব্যটি বর্তমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এসেছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুল্ক নিয়ে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে নতুন করে পাল্টা শুল্ক ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপ দেখা দিয়েছে।
‘ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব
কানাডার সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো আরও বিস্তৃত করার একটি প্রস্তাবও দিয়েছেন ফন ডার লায়েন। তিনি একটি ‘ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠনের ধারণা সামনে আনেন, যেখানে যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন, কানাডা ও নরওয়ের মতো ইউরোপের বাইরের ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়াকে ঘিরে ইউরোপের নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে এ ধরনের কাঠামো গঠনের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে নেতাদের একটি বিস্তৃত প্ল্যাটফর্ম গঠনের আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। বর্তমান ঝুঁকির ধরন ও মাত্রার কারণে সেই উদ্যোগ এখন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
ফন ডার লায়েনের প্রস্তাবের বিস্তারিত কাঠামো এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে ধারণাটি বাস্তবায়িত হলে ইইউর সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি কানাডা, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও ইউক্রেনের মতো ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের নিয়ে ইউরোপীয় নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে।
কানাডা-ইইউ সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা
কানাডা ও ইইউর মধ্যে ইতোমধ্যেই ‘কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ (সিইটিএ) নামে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। নতুন ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ ধারণার মাধ্যমে এই বিদ্যমান সম্পর্কের বাইরে গিয়ে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও কৌশলগত শিল্পে আরও গভীর সহযোগিতার কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কানাডার সঙ্গে ইইউর সম্পর্ক প্রচলিত বাণিজ্য অংশীদারত্বের চেয়ে আরও বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও সরবরাহব্যবস্থার মতো কৌশলগত খাতে দুই পক্ষের সহযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এটি এখনও একটি রাজনৈতিক প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ মর্যাদার কোনো প্রতিষ্ঠিত আইনি কাঠামো ইইউতে নেই। ফলে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক সম্মতি ও বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন হবে। কানাডার সঙ্গে ইইউর এই নতুন সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কী রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনা ও চুক্তির ওপর।
কার্নির বৃহস্পতিবারের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ভাষণে এই প্রস্তাব নিয়ে কানাডার অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে কানাডা-ইইউ সম্পর্ক ভবিষ্যতে শুধু বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আরও বিস্তৃত কৌশলগত কাঠামো পাবে—সেদিকেই এখন নজর।
সূত্র: বিবিসি



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত