ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৬:৫০ এএম

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)। এই ফলকে শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ইউরোপজুড়ে কট্টর ডানপন্থীদের উত্থানের নতুন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
রোববারের নির্বাচনে স্যাক্সনি-আনহাল্টে বড় ব্যবধানে এগিয়ে যায় এএফডি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নাৎসি আমলের ভয়াবহ ইতিহাসের কারণে জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ সতর্কতা রয়েছে। তাই এএফডির এই সাফল্য দেশটির গণ্ডি ছাড়িয়ে ইউরোপজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে ইউরোপে অভিবাসনবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে কট্টর ডানপন্থী দলগুলো জনসমর্থন বাড়াচ্ছে।
ইউরোপবিষয়ক বিশ্লেষক মুজতবা রহমান বলেন, ইউরোপের উন্নত দেশগুলো এক ধরনের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারগুলো মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও অন্যান্য উদ্বেগের কার্যকর সমাধান দিতে না পারায় ভোটারদের একটি অংশ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে।
মের্ৎসের ওপর বাড়ছে চাপ
স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের জন্যও অস্বস্তির কারণ হতে পারে। তাঁর নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) তুলনায় এএফডি দ্বিগুণেরও বেশি ভোট পেয়েছে।
তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসন থেকে পিছিয়ে থাকতে পারে এএফডি। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও দলটির সরকার গঠন কঠিন হতে পারে। অন্য দলগুলোও এএফডির সঙ্গে জোটে যেতে অনাগ্রহী।
এএফডির বিরুদ্ধে উগ্র ডানপন্থী অবস্থান এবং নাৎসি আমলের বক্তব্যকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দলের কয়েকজন নেতার বিতর্কিত বক্তব্য নিয়ে অতীতেও সমালোচনা হয়েছে। জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থাও দলটিকে উগ্রপন্থার সন্দেহে পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
তবু এই নির্বাচনী সাফল্য মের্ৎসের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। দলের ভেতর থেকে পরাজয়ের দায় তাঁর ওপর এলে চ্যান্সেলরের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফ্রান্সে নজর লে পেনের দিকে
জার্মানির পর ইউরোপের নজর এখন ফ্রান্সের দিকে। আগামী বসন্তে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
এই পরিস্থিতিতে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির নেতা মারিন লে পেন শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে প্রথম দফার ভোটে তিনি অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় এগিয়ে আছেন।
ফ্রান্সে কট্টর ডানপন্থীরা ক্ষমতায় এলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়ায় এর প্রভাব পুরো ইউরোপেই পড়তে পারে।
স্পেন-যুক্তরাজ্যেও বাড়ছে ডানপন্থী চাপ
স্পেনেও কট্টর ডানপন্থী ভক্স পার্টির প্রভাব বাড়ছে। দুর্নীতির অভিযোগ, অভিবাসন ইস্যু ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে ক্ষমতাসীন সমাজতন্ত্রীদের জনপ্রিয়তা কমেছে। ফলে ভবিষ্যতে জোট সরকারে ভক্সের অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
যুক্তরাজ্যেও ডানপন্থী রাজনীতির প্রভাব বাড়ছে। নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এরই মধ্যে আরও ডানপন্থী একটি দল ফারাজের ভোটব্যাংকে ভাগ বসানোর চেষ্টা করছে।
অরবানের পরাজয় কি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে?
তবে ইউরোপে কট্টর ডানপন্থীদের উত্থান যে একমুখী, এমন নয়। গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবান নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তাঁর পরাজয় মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ভিন্ন কৌশল। নব্য ফ্যাসিবাদী শিকড় থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতায় এসে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো ইস্যুতে তিনি তুলনামূলক মধ্যপন্থী অবস্থান নিয়েছেন। তবে তাঁর চেয়েও বেশি ডানপন্থী শক্তির উত্থান তাঁকে অভিবাসন ইস্যুতে আরও কঠোর অবস্থান নিতে চাপ দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে জার্মানির এই নির্বাচন ইউরোপের সামনে বড় একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—অর্থনৈতিক চাপ, অভিবাসন ও প্রচলিত রাজনীতির প্রতি অসন্তোষ কি কট্টর ডানপন্থীদের আরও শক্তিশালী করবে, নাকি মূলধারার দলগুলো সময় থাকতেই ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে?
আগামী বছর ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালিসহ ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নির্বাচনই হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট করে দেবে।



© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত