সফিউর রহমান সফিক
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৪৩ এএম

শিক্ষা খাতে মাফিয়া চক্র !এখনো অধরা
——————————————–
দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতকে জিম্মি করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল দুর্নীতির নেটওয়ার্ক। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে (ডিপিই) কর্মরত শিক্ষা অফিসার নূর মোহাম্মদ এবং পাবনা সদর উপজেলার সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সাঈদা শবনমের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ, প্রশ্নপত্র ফাঁস, এবং বদলি বাণিজ্যে ও অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে শত কোটি টাকা। এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উক্ত চক্রটির বিরুদ্ধে । অনুসন্ধানে জানা গেছে, একের পর এক চাঞ্চল্যকর অপরাধের পরও এই চক্রের সদস্যরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে রাজকীয় কায়দায় বহাল তবিয়তে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড
অনুসন্ধানে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা এলেই তৎপর হয়ে ওঠে এই সিন্ডিকেট। চক্রের মূল হোতা শিক্ষা অফিসার নূর মোহাম্মদ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন গোপন তথ্য ও যোগসূত্র ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যবস্থা করেন। অন্যদিকে, মাঠ পর্যায়ে ক্লায়েন্ট বা প্রার্থী ধরা এবং টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন পাবনা সদরের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সাঈদা শবনম।চাকুরি প্রার্থীদের কাছ থেকে লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন সরবরাহ এবং শতভাগ পাস করিয়ে দেওয়ার চুক্তিতে প্রতি প্রার্থীর কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। শুধু নিয়োগই নয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাঙ্ক্ষিত স্থানে বদলি করার ক্ষেত্রেও এই চক্রের অনুমতি এবং মোটা অঙ্কের ঘুষ বাধ্যতামূলক। এমন অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে ছিল দীর্ঘদিন থেকে ।
ব্ল্যাকমেলিং ও কোটি টাকার চাঁদাবাজি
নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের পাশাপাশি এই সিন্ডিকেটের আয়ের আরেকটি বড় উৎস হলো সরকারি ও বেসরকারি চাকুরিজীবী এবং বিভিন্ন লাভজনক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেলিং করা। বিভিন্ন অজুহাতে প্রশাসনিক ভয়ভীতি দেখিয়ে, আবার কারো সাথে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে কিংবা ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য ফাঁস করার হুমকি দিয়ে এই চক্রটি লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। এই বিষয়ে এই চক্রের নামে থানায় একাধিক জিডি ও অভিযোগ রয়েছে । কোনো কোনো ভুক্তভোগী সম্মান ও চাকুরি বাঁচানোর তাগিদে নীরবে এই সিন্ডিকেটকে কোটি টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে গোপন সূত্রে জানা গেছে।
অদৃশ্য খুঁটির জোর
স্ট্যান্ড রিলিজের পরও বহাল এই সিন্ডিকেটের প্রশাসনিক ক্ষমতা কতটা শক্তিশালী তার প্রমাণ মেলে সাঈদা শবনমের বদলি ও কর্মস্থলে অবস্থানের তথ্যে। পাবনা সদরে দীর্ঘ প্রায় আট বছর ধরে একই কর্মস্থলে জেঁকে বসা এই কর্মকর্তাকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ফরিদপুর উপজেলায় বদলি করা হলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় বারবার সেই আদেশ স্থগিত হয়ে যায়। এমনকি অতি সম্প্রতি অধিদপ্তর থেকে তাকে বাধ্যতামূলক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) করা হলেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে পূর্বের এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন এবং দীর্ঘদিন পর নতুন কর্মস্থলে যোগ দেন এর সাথে সিন্ডিকেটের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
বেনামে সম্পদের পাহাড়
রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশ এলাকা এবং ময়মনসিংহ ও দেশজুড়ে ডুপ্লেক্স ও বাগানবাড়ি একজন সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও নূর মোহাম্মদ ও সাঈদা শবনম চক্র গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার এক অকল্পনীয় দুর্নীতির সাম্রাজ্য। অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের নামে-বেনামে থাকা বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে এরমধ্যে রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট ঢাকার অভিজাত এলাকায় নামে এবং ছদ্মনামে কেনা হয়েছে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস।
ময়মনসিংহে ডুপ্লেক্স ও বাগানবাড়ি
ময়মনসিংহ অঞ্চলে গড়ে তোলা হয়েছে সুবিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ি ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বাগানবাড়ি। কৃষি ও মৎস্য খামার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিঘার পর বিঘা জমি জুড়ে রয়েছে বিশাল মাছের খামার এবং একাধিক উন্নত জাতের ফলের বাগান। এই বিশাল সম্পদের সিংহভাগই আড়াল করার জন্য নিকটাত্মীয় বা বিশ্বস্ত সহযোগীদের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা
প্রাথমিক শিক্ষা খাতের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় এমন একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়ায় সাধারণ শিক্ষক ও চাকুরি প্রত্যাশীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি,
অনতিবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং উচ্চতর গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নূর মোহাম্মদ ও সাঈদা শবনম সিন্ডিকেটের ব্যাংক হিসাব তদন্ত করে তাদের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হোক এবং ফৌজদারি আইনের আওতায় এনে এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেওয়া হোক। এমন দাবি উঠেছেন বিভিন্ন মহল থেকে।
এদিকে নূর মোহাম্মদ ও সাঈদা শবনমের নানান অনিয়ম অপকর্মের অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানতে মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেওয়ার পরও তারা ফোন রিসিভ করেননি ।




© 2026 Times of Asia 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত